সাঁওতালদের আত্মত্যাগের স্মরণে বিদ্রোহ দিবস পালিত
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদারি শোষণ ও মহাজনী প্রথার বিরুদ্ধে ১৮৫৫ সালের ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর শহীদদের স্মরণে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পালিত হয়েছে ১৭১তম মহান হুল দিবস। ‘হুল হুল হুলে হুল, ত্রিশে জুন হুলে হুল’ স্লোগানে মঙ্গলবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদ। অনুষ্ঠানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে প্রায় আড়াই হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ অংশ নেন।
শহরের ভানুগাছ রোডস্থ জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বিদ্রোহী নেতা সিধু ও কানুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদের নেতারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং সিধু ও কানুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রবীণ ব্যক্তিত্ব সুজিত সাঁওতাল। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দুলাল সাঁওতাল ও স্বপন সাঁওতাল।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয় বনিক, সিনিয়র সাংবাদিক ইসমাইল মাহমুদ, বাংলাদেশ চা শ্রমিক আদিবাসী ফ্রন্টের সভাপতি পরিমল সিং বাড়াইক, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি বঙ্গকবি লুৎফুর রহমান, হাজী আব্দুল গফুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক প্রদীপ সাঁওতাল এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তী।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন সুমন সাঁওতাল, জবা সাঁওতাল, রনজিত সাঁওতাল, সমর সাঁওতাল, দয়ামনি সাঁওতাল, নরেশ সাঁওতাল, প্রদীপ সাঁওতাল, কমল সাঁওতাল, রাঙাচরণ সাঁওতাল, শ্যামল সাঁওতাল ও বিষ্ণু সাঁওতালসহ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
বক্তারা বলেন, ইতিহাসে এ আন্দোলন ‘সাঁওতাল হুল’ বা ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ‘হুল’ শব্দের অর্থ বিদ্রোহ বা মুক্তির সংগ্রাম। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসন, জমিদার ও মহাজনদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা উপমহাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, আত্মমর্যাদা ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

তাঁরা বলেন, সাঁওতাল বিদ্রোহ কেবল একটি গণঅভ্যুত্থান নয়, এটি শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের উজ্জ্বল ইতিহাস। নতুন প্রজন্মের কাছে এ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে এবং সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রকৃত ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক পর্বে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গান ও বিভিন্ন লোকজ পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রবীণদের মতে, উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদারি ব্যবস্থা ও মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর অঞ্চলে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন এ বিদ্রোহের সূচনা হয়। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন চার ভাই সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব এবং তাঁদের দুই বোন ফুলমনি ও ঝানু।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সাঁওতালদের প্রচলিত কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ বিদ্রোহ ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাঁওতাল যোদ্ধারা ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এ সংঘাতে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা প্রাণ হারান।
বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ তদন্ত করে এবং ভাগলপুর ও বীরভূমের কিছু অংশ নিয়ে ‘সাঁওতাল পরগনা’ জেলা গঠন করে। পরবর্তীতে তাদের ভূমি ও সামাজিক অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।








