বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ
মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও পাহাড়ি খাদের কাদা-পানি ভেঙে বুকে হেঁটে এগিয়ে গিয়েছিলেন ১৮ বছরের এক অকুতোভয় তরুণ। লক্ষ্য ছিল একটাই যেকোনো মূল্যে স্তব্ধ করতে হবে সহযোদ্ধাদের পথ আটকে রাখা পাকিস্তানি হানাদারদের স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান। নিখুঁত নিশানায় ছুড়লেন দুটি গ্রেনেড, গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়েই জড়িয়ে পড়লেন মরণপণ হাতাহাতি যুদ্ধে। ধ্বংস হলো শত্রুঘাঁটি, মুক্ত হলো মাতৃভূমির সীমান্ত ফাঁড়ি; আর রণাঙ্গনে রক্ত ঢেলে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখালেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান।
আজ ২৮ অক্টোবর, এই নির্ভীক বীরের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী।
১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দলই সীমান্ত ফাঁড়ি পুনর্দখলে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রচিত হয়েছিল। সেদিন ভোররাতে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শত্রুঘাঁটি লক্ষ্য করে চতুর্মুখী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেন।
চারদিকে চা বাগানে ঘেরা এই এলাকায় তুমুল লড়াই চলাকালে ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান অবিরাম গুলি ছুড়তে থাকে। মাইনের ফাঁদ আর মেশিনগানের গুলিবৃষ্টির মুখে মুক্তিবাহিনীর সামনে এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মুক্তিকামী সহযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে ও অভিযানের গতি সচল রাখতে নিজেই মেশিনগান পোস্ট ধ্বংসের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব তুলে নেন সিপাহি হামিদুর রহমান।
অন্ধকারের মধ্যে পাহাড়ি নালার জল-কাদা পেরিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে শত্রু অবস্থানে পৌঁছে গ্রেনেড হামলা চালান তিনি। শত্রুঘাঁটি কেঁপে উঠলেও প্রতিপক্ষের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় তাঁর শরীর। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের মধ্যেও চরম ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে তিনি সরাসরি পাকিস্তানি বাঙ্কারে ঢুকে পড়েন এবং সেখানে অবস্থানরত দুই সেনাকে পরাস্ত করে ভারী অস্ত্রটি চিরতরে অকার্যকর করে দেন।
এই বীরোচিত আত্মত্যাগের সুযোগ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়ে দলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। নিশ্চিত বিজয়ের মুখে রণাঙ্গনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হামিদুর রহমান। বিজয়ের পর সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের একটি পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করেন।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামের সন্তান হামিদুর রহমান স্বাধীনতার পর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ত্রিপুরার মাটি থেকে তাঁর দেহাবশেষ মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে এনে ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
আজ কমলগঞ্জের ঐতিহাসিক দলই সীমান্তে নির্মিত স্মৃতিসৌধে স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের জনতার পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে দেশের এই সূর্যসন্তানকে।







