ধলাইয়ের বুকে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সুর, মাছ শিকারের উল্লাসে শতবর্ষী ‘পলো বাওয়া’ উৎসব
শরতের স্বচ্ছ জলরাশি ছিটিয়ে ধলাই নদীর দুই পাড়ে তখন উৎসবের কোলাহল। কারো হাতে বাঁশ আর বেতের কারুকাজে তৈরি পলো, কারো কাঁধে উড়াল জাল কিংবা প্লেইন জাল। নদীর বুকে দলবেঁধে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে জেগে ওঠে শত বছরের পুরনো এক স্মৃতি বাংলার চিরন্তন ‘পলো বাওয়া’ উৎসব।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বেলা ১১টায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানসংলগ্ন ধলাই নদীর স্টিল ব্রিজের উজানে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী এই মাছ ধরার মহোৎসব। উপজেলার রহিমপুর ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের কালাছড়া, দেবিপুর, ধর্মপুর, জসমতপুর, বড়চেগ, চৈত্রঘাট, সিদ্ধেশ্বরপুর ও রামচন্দ্রপুরসহ আশপাশের নানা গ্রাম থেকে আসা দুই শতাধিক শৌখিন মাছ শিকারি এতে অংশ নেন।
মাছ ধরার কৌশলে ছিল চমৎকার শৃঙ্খলা ও দলগত বোঝাপড়া। নদীর একপ্রান্তে ৩০ থেকে ৪০ জন জাল নিয়ে সতর্ক অবস্থানে দাঁড়িয়ে ব্যুহ তৈরি করেন, আর অপর প্রান্ত থেকে সারিবদ্ধভাবে ৪০-৫০ জনের দল পলো পানিতে চাপিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। ছোট-বড় দেশীয় মাছ শিকারে সবার চোখেই ছিল রোমাঞ্চ। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শত শত নারী-পুরুষ ও শিশুর করতালি আর হর্ষধ্বনি পুরো আয়োজনকে পরিণত করে এক মিলনমেলায়।
উৎসবে অংশ নেওয়া প্রবীণ শিকারি নুর মিয়া স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, বছরের এই দিনটির জন্য সারাটা বছর পথ চেয়ে থাকি। কত মাছ পেলাম সেটা বড় কথা নয়, দলবেঁধে একসঙ্গে নামার আনন্দটাই আসল। তবে নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস এবং অসাধু উপায়ে বিষ প্রয়োগের ফলে আগের মতো মাছ ও পানি না থাকায় উৎসবের জৌলুশ দিনে দিনে ফিকে হয়ে আসছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
ইলিয়াস মিয়া ও আব্দুল আহাদের মতো তরুণ ও শৌখিন শিকারিদের মতে, আধুনিকতার ভিড়ে যখন গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই ‘পলো বাওয়া’ মানুষে মানুষে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন রচনা করে। নদীমাতৃক বাংলার এই অনন্য ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত আয়োজন ও নদী সংরক্ষণের তাগিদ দেন তারা।







