রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কমলগঞ্জে ধলাই নদীতে টমটম চালক নিখোঁজ কমলগঞ্জে তিন মাসব্যাপী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ শুরু কমলগঞ্জে গভীর রাতে রাইস মিলসহ দোকান ভাঙচুর কমলগঞ্জে গভীর রাতে রাইস মিলসহ দোকান ভাঙচুর ভিডিপি সদস্য আশরাফুল আলমের উদ্যোগে কমলগঞ্জের মুন্সিবাজারে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চা পাতা তুলতে গিয়ে খৈয়া গোখরা, আতঙ্কে শ্রমিকদের কাজ বন্ধ কমলগঞ্জে কমলার বাগান উচ্ছেদ, ফিরছে বনের সবুজ কমলগঞ্জে ১ম কমিউনিটি পুলিশিং কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত কমলগঞ্জে মামলা প্রত্যাহারে হুমকির অভিযোগ প্রবাসীর স্ত্রীর কমলগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির ফলাফলে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

হালের পেছনে মাছ শিকার, মৌলভীবাজারের মাঠে আমন রোপণের উৎসব

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: / ২৯ দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

একদিকে আমন ধানের চারা রোপণের ব্যস্ততা, অন্যদিকে হালচাষ করা কাদামাখা জমিতে দেশীয় মাছ শিকারের উৎসব। মৌলভীবাজারজুড়ে এখন এমনই দৃশ্য। আউশ ধান কাটার পর একের পর এক জমি আমন চাষের জন্য প্রস্তুত করছেন কৃষকেরা। মেশিনের হালচাষে জমির কাদামাটি উল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির নিচে থাকা শিং, মাগুর, কৈ, পুঁটি ও টাকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ভেসে উঠছে। আর মাছ ধরতে হালের পেছনে পেছনে ছুটছেন স্থানীয় মানুষ।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ব্যস্ত কৃষকের সঙ্গে মাছ শিকারিদেরও ভিড়। কারও হাতে ছোট জাল, কারও হাতে ঝুড়ি বা পলিথিনের ব্যাগ। কেউ আবার খালি হাতেই কাদামাখা জমি থেকে মাছ ধরছেন। শখের বসে মাছ ধরার পাশাপাশি অনেকেই পরিবারের খাবারের জন্য সংগ্রহ করছেন এই দেশীয় মাছ।

কৃষকেরা জানান, আউশ ধান কাটার পর আমন রোপণের জন্য জমিতে পানি রেখে মেশিনের মাধ্যমে হালচাষ করা হয়। দীর্ঘদিন ধান ও পানির নিচে থাকা মাছগুলো এ সময় কাদামাটি উল্টে দেওয়ার কারণে ওপরে উঠে আসে। ফলে হালচাষের সময় জমিতে মাছ ধরা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।

কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষক জমসেদ মিয়া বলেন, ‘এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় জমিতে মাছের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে বেশি। অনেকেই শখের বসে মাছ ধরতে নামছেন। আউশ ধান কাটার পর আমন রোপণের জন্য জমি চাষ করার সময় এসব মাছ বেশি পাওয়া যায়।’

একই উপজেলার কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ‘বাড়ির পাশের জমিতে মেশিন দিয়ে হালচাষ করা হচ্ছিল। দেখি, মেশিনের পেছনে কয়েকজন মাছ ধরছেন। শিং, মাগুর, পুঁটি, কৈ ও টাকি মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পরে আমিও মাছ ধরতে নেমে যাই। প্রায় দুই কেজি মাছ পেয়েছি।’

কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ‘তাঁর আউশ ধানের জমিতে হালচাষ করার সময় প্রচুর দেশীয় মাছ দেখা গেছে। পরে আশপাশের অনেক মানুষ মাছ ধরতে নেমে পড়েন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন জমিতে ধান ও পানি থাকায় মাছ ধরা সম্ভব হয়নি। এখন আমন ধানের চারা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে মাছগুলো ধরা পড়ছে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর মৌলভীবাজারে ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার বেশির ভাগ জমির আউশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এখন পুরোদমে চলছে আমন ধানের চারা রোপণ। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হবে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, ‘আউশ ধান কাটার পর আমন রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। জেলার বেশির ভাগ এলাকায় ইতিমধ্যে আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে, কোথাও কোথাও শেষ পর্যায়েও রয়েছে। এ বছর আউশ ধানের ফলন ভালো হয়েছে বলেও জানান তিনি।’

তবে কৃষিজমিতে মাছ পাওয়ার এই চিরচেনা দৃশ্যের মধ্যেও দেশীয় মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মৎস্য বিভাগের। একসময় মৌলভীবাজারের হাওর, বিল, খাল ও কৃষিজমিতে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রজাতির মাছ কমে গেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন নানা কারণে অনেক প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে খাল-বিল ও কৃষিজমিতে দেশীয় মাছের যে প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র তৈরি হয়, তা সংরক্ষণ করা জরুরি। দেশীয় মাছ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’

প্রকৃতির নিয়মে বর্ষার পানিতে কৃষিজমি, খাল ও বিলের সঙ্গে তৈরি হওয়া জলাভূমির সংযোগই দেশীয় মাছের বংশবিস্তার ও বিচরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষকের জমিতে এখন যে মাছের দেখা মিলছে, তা শুধু গ্রামীণ জীবনের একটি আনন্দের দৃশ্য নয়, এটি দেশের ক্রমহ্রাসমান দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য রক্ষার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

ধানের চারা হাতে কৃষক যখন নতুন মৌসুমের স্বপ্ন বুনছেন, তখন সেই একই জমির কাদামাটিতে শিং-মাগুর কিংবা কৈ-পুঁটি খুঁজে ফিরছেন গ্রামের মানুষ। মৌলভীবাজারের গ্রামবাংলার বর্ষার এই দৃশ্য যেন কৃষি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার এক অন্যরকম মিলনমেলা।


এই বিভাগের আরও খবর :
এক ক্লিকে বিভাগের খবর