কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে ভেলকিবাজির উন্নয়ন
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার কাজে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করার চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির এক পর্যায়ে দেখা যায় যে, রাতে তড়িঘড়ি করে বসানো ত্রুটিপূর্ণ টাইলস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে রাতেই আবার তুলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে জানা যায়, গত রবিবার (৭জুন) রাতে আঁধারে বিদ্যুতহীন অবস্থায় হাসপাতালের রান্নাঘরে টাইলস বসানোর কাজ চলছিল। নিয়ম অনুযায়ী দেয়ালের পুরাতন প্লাস্টার বা আস্তরণ ভেঙে বা খোদাই করে টাইলস বসানোর কথা থাকলেও, তা না করেই সরাসরি পুরাতন আস্তরণের ওপর টাইলস লেপে দেওয়া হচ্ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত স্থানীয়রা এবং সাংবাদিকরা কাজের এই ধরন নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং কর্মরত শ্রমিকদের প্রশ্ন করলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও লেখালেখি শুরু হলে, তড়িঘড়ি করে রাতের মাঝেই আবার সেই টাইলসগুলো খুলে ফেলা হয়।
রাতের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার দুপুরে আবারও হাসপাতালের কাজ নিয়ে একই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের পুরাতন ভবনের নার্সদের রুমে টাইলস বসানোর কাজ চলছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, আগের রাতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে ঠিক একই কায়দায় কাজ করা হচ্ছিল। ফ্লোরের প্লাস্টার না ভেঙে, এমনকি কোনো রকম খোদাই (চিপিং) না করেই সরাসরি সিমেন্ট-বালুর দুর্বল মিশ্রণ দিয়ে টাইলস বসানো হচ্ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যদি প্রতিবাদ না করতাম, তবে ঠিকাদার রাতের অন্ধকারেই এই জেনোতেনো কাজ শেষ করে বিল তুলে চলে যেত। কিছুদিন আগেও এই হাসপাতালের ছাদ ঢালাইয়ের কাজেও ব্যাপক অনিয়ম দেখা গিয়েছিল, যার কারণে কাজ সাময়িক বন্ধও থাকে এবং পর দিন তা সম্পন্ন করা হয়। আমরা এই সরকারি হাসপাতালের কাজের সঠিক ও স্থায়ী সমাধান চাই।
কাজের এমন ভয়াবহ অনিয়ম ও নিম্নমানের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাসনিয়া কনস্ট্রাকশন এর প্রতিনিধি নান্টু মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, কাজের তদারকির দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের, আমার না।” ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে স্থানীয়দের মনে আরও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
কাজের অনিয়ম প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, গত রাতেও অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে আমি তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আজকেও সরেজমিনে কাজ পরিদর্শন করে পুনরায় সঠিক ও নিয়মমাফিক করার জন্য কঠোর পরামর্শ দিয়েছি। বিষয়টি ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

বিষয়টি আমলে নিয়ে সাথে সাথে পদক্ষেপ নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমি নিজে সরেজমিনে হাসপাতালের কাজ পরিদর্শন করেছি। কাজের মান শতভাগ বজায় রাখতে এবং সঠিক নিয়মে যেন পুরো কাজ সম্পন্ন হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মের বাইরে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে মৌলভীবাজার জেলা নির্বাহী স্বাস্থ্য প্রকৌশলী সুব্রত দেবনাথ বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা আজ মঙ্গলবার সকালে প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে তদন্ত করি। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় ইতিমধ্যেই আমরা আসার আগেই দেয়ালে লাগানো টাইলসগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী শতভাগ মান বজায় রেখেই বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতি বরদাশত করা হবে না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন হরিলুট ও দায়সারা কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কমলগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণ।







