শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়ম প্রকাশ: দুই সাংবাদিকসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিনের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় দুই সাংবাদিকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওই কর্মকর্তা বাদী হয়ে গত ২৫ অক্টোবর সিলেট সাইবার সিকিউরিটি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকরা হলেনন দৈনিক ‘খোলা কাগজ’-এর মৌলভীবাজার জেলা স্টাফ রিপোর্টার ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. এহসানুল হক (এহসান বিন মুজাহির) এবং দৈনিক ‘জনবাণী’র জেলা প্রতিনিধি মঞ্জু বিজয় চৌধুরী।
মামলা সূত্রে জানা যায়, মানহানি, কুৎসা রটনা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ এনে এ মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাংবাদিক মঞ্জু বিজয় চৌধুরীকে। এছাড়া অন্যান্য আসামিরা হলেন—বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস নেতা মোজাহিদুল ইসলাম, সাংবাদিক মো. এহসানুল হক, ফেসবুক পেজ ‘জেন জেড শ্রীমঙ্গল’ এবং প্রবাসী আমির আলী। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়েছেন এবং পোস্ট মুছে ফেলার বিনিময়ে অর্থ দাবি করেছেন। আদালত আবেদনটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে মামলাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক এবং স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক এহসানুল হক জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানা অনিয়ম নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছেন। এর মধ্যে ‘মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহ’, ‘রাতে সরকারি হাসপাতালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন’, ‘জেনারেটর বিকল থাকায় মোমবাতি জ্বালিয়ে চিকিৎসা’, ‘এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে অনিয়ম’ এবং ‘তদন্তের দাবির মুখেই ডা. সিনথিয়ার বদলি’ সংক্রান্ত একাধিক প্রতিবেদন সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাইয়ে ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর আওতায় তিনি টিএইচওর নিকট ১১টি সুনির্দিষ্ট তথ্যের আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিলেন। যার মধ্যে রোগী কল্যাণ তহবিল, সরকারি চালানের অনুলিপি, উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং আইপিএস চুরির তদন্ত প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এহসানের দাবি, এসব অনিয়ম প্রকাশ্যে আসা ও তথ্য চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্নীতি ঢাকতে ডা. সিনথিয়া এই সাজানো মামলাটি দায়ের করেছেন।
মামলার প্রধান আসামি সাংবাদিক মঞ্জু বিজয় চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “হাসপাতালের প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশ করায় নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতেই এই হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। আমরা ডা. সিনথিয়ার পূর্ববর্তী ও শ্রীমঙ্গলের কর্মস্থলের সব দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি।”
এ ঘটনায় মৌলভীবাজারের গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জাফর ইকবাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা সাইবার আইনে মামলা ঠুকে দেওয়া যেন এক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এভাবে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না।
অবিলম্বে এই হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার নামে দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।







