পাইলট হয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করার পথে কমলগঞ্জের মাহির
এক বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন, এক অদম্য তরুণের উড্ডয়ন আর একটি পরিবারের গর্বের গল্প এখন ডানা মেলছে সুদূর মার্কিন মুলুকে। সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ৫নং কমলগঞ্জ ইউনিয়নের লংগুরপাড় গ্রামের এক কৃতি সন্তান আহনাফ আবিদ মাহির এবার বিশ্বজয়ের পথে পা বাড়িয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশন সফলভাবে সম্পন্ন করে ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহ্যবাহী সান জোসে স্টেট ইউনিভার্সিটি (San José State University)-তে এভিয়েশন বিভাগে ‘প্রফেশনাল ফ্লাইট স্পেশালাইজেশন’-এ (পাইলট কোর্স) ভর্তির গৌরব অর্জন করেছেন তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থী মাহির। গত বছর আমেরিকায় এই প্রথম সর্বকনিষ্ট পাইলট হিসবে বিমান উড্ডয়ন করেন মাহির।
মাহিরের এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারকেই নয়, পুরো কমলগঞ্জ তথা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গর্বিত করেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাহিরের পিতা মো. মইনুল হক (আহাদ)-এর ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার, একজন পেশাদার পাইলট হওয়ার। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা, কঠোর সংগ্রাম এবং পারিবারিক দায়িত্বের কারণে সেই স্বপ্ন তখন অপূর্ণই থেকে যায়। তবে স্বপ্ন কখনো হারিয়ে যায় না; তা কেবল এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে ছেলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন তিনি ও তাঁর সহধর্মিণী আয়েশা রুনা।
লংগুরপাড় গ্রামের মরহুম মোহাম্মদ এলাইছ মিয়ার ছোট ছেলে মো. মইনুল হক ও তাঁর পরিবারের সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশে ‘Origin Logistics & Services’ এবং ‘Origin BM Corporation’-এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখার পর, এই দম্পতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমান। বর্তমানে তাঁরা নর্থ হলিউডে অত্যন্ত সুনামের সাথে ‘Spice N Curry Indian Grocery & Restaurant’ পরিচালনা করছেন। তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের চেয়েও তাঁদের কাছে বড় লক্ষ্য ছিল সন্তানের উচ্চশিক্ষা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
মাহিরের এই সাফল্যে লন্ডনে অবস্থানরত তাঁর ফুফাতো ভাই মিজানুর রহমান অত্যন্ত আবেগঘন এক বার্তায় আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, আজ মাহির শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি, আজ একজন বাবার বহু বছরের স্বপ্ন নতুন ডানা পেয়েছে। একজন মায়ের ত্যাগ সার্থক হয়েছে। একদিন যখন মাহির পাইলটের ইউনিফর্ম পরে আকাশে উড়বে, তখন শুধু লংগুরপাড় বা কমলগঞ্জ নয়, পুরো বাংলাদেশ ওর জন্য গর্ব অনুভব করবে। আমি তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

ছেলের এমন গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দ প্রকাশ করে মো. মইনুল হক (আহাদ) বলেন, একসময় আমার নিজের চোখে স্বপ্ন ছিল পাইলট হয়ে আকাশে ওড়ার। কিন্তু জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, দায়িত্ব আর বাস্তবতার কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। আজ যখন আমার ছেলে আমেরিকার এত বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এভিয়েশন নিয়ে পড়ার সুযোগ পেল, আমার মনে হচ্ছে ওর ডানায় ভর করে আসলে আমার সেই বহু বছরের অপূর্ণ স্বপ্নটাই আজ আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর গর্বের মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রবাসে যতই ব্যস্ত থাকি না কেন, আমাদের শিকড় সবসময় বাংলাদেশেই পড়ে থাকে। আমার বাবা মরহুম মোহাম্মদ এলাইছ মিয়ার আদর্শ এবং আমাদের কমলগঞ্জের লংগুরপাড় গ্রামের মাটির শিক্ষা আমি সন্তানদের মাঝে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মাহির যেন পড়াশোনা শেষ করে একজন সৎ ও দক্ষ পাইলট হয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে, সেজন্য আমি আমার দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে দোয়া চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সম্পন্ন করে মাহির ইতিমধ্যেই তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির করেছেন। একজন দক্ষ ও পেশাদার পাইলট হয়ে তিনি বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে চান। মাহিরের এই কৃতিত্বে তাঁর গ্রামের বাড়ি কমলগঞ্জের লংগুরপাড়সহ পুরো এলাকায় আনন্দ ও গর্বের আবহ বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাচ্ছেন।







