সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; সিএনজিচালকের উদ্যোগে প্রবাসীর হারানো ব্যাগ উদ্ধার
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সততা ও মানবিকতা নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় হারিয়ে যাওয়া একটি মূল্যবান ব্যাগ ফিরে পেয়েছেন সৌদি আরবপ্রবাসী লিটন মিয়া। ব্যাগটিতে ছিল পাসপোর্ট, বিমানের টিকিট, স্বর্ণালংকারসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।
দুই মাসের ছুটিতে দেশে আসা লিটন মিয়া গত রোববার শ্রীমঙ্গল শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথে অসাবধানতাবশত নিজের ব্যাগটি অটোরিকশায় ফেলে যান। বাড়িতে পৌঁছে বিষয়টি টের পাওয়ার পর শুরু হয় দুশ্চিন্তা আর খোঁজাখুঁজি। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও মূল্যবান সামগ্রী হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি।
লিটন মিয়া জানান, গভীর উদ্বেগের মধ্যে রাত সাড়ে ১২টার দিকে অটোরিকশাচালক জাহিদ হাসান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরে নিজেই ব্যাগটি ফিরিয়ে দেন। ব্যাগের সবকিছু অক্ষত অবস্থায় পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এমন মানুষই আমাদের সমাজের আসল সম্পদ।’
অন্যদিকে অটোরিকশাচালক জাহিদ হাসান জানান, ‘সন্ধ্যার দিকে শ্রীমঙ্গলের হবিগঞ্জ সড়কের এনা কাউন্টারের সামনে থেকে লিটন মিয়াকে যাত্রী হিসেবে তুলে আকবরপুর এলাকায় নামিয়ে দেন। পরে গাড়ি ফেরার সময় অটোরিকশার ভেতরে একটি ব্যাগ দেখতে পান। যাত্রীর ব্যাগ বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফিরে গিয়ে খোঁজ করেন, কিন্তু মালিককে পাননি।’
পরবর্তীতে ব্যাগ খুলে পাসপোর্ট ও স্বর্ণালংকার দেখতে পেয়ে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন তিনি। পাসপোর্টে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় ফেসবুকে বিষয়টি ছড়িয়ে দেন এবং সিএনজি মালিক সমিতিকেও জানান। অবশেষে রাতে একটি দোকানের সূত্র ধরে ব্যাগের মালিকের সন্ধান পান।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ব্যাগটি লিটন মিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমি ভাড়া করা সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাই। কিন্তু ব্যাগটি হাতে পেয়ে মনে হয়েছে, এর মালিক কতটা দুশ্চিন্তায় আছেন। স্বর্ণালংকার দেখেও লোভ হয়নি। কারও জিনিস আত্মসাৎ করে সুখে থাকা যায় না। ব্যাগটি ফিরিয়ে দিয়ে যে শান্তি পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
স্থানীয়দের মতে, ‘শ্রীমঙ্গল এমন একটি এলাকা যেখানে পর্যটক কিংবা যাত্রীদের ফেলে যাওয়া জিনিস ফিরে পাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে জাহিদের সততা এই মানবিক মূল্যবোধের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
সমাজের সচেতন মহল বলছে, ‘এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে—সততা ও মানবিকতা এখনো সমাজ থেকে হারিয়ে যায়নি। বরং জাহিদদের মতো মানুষই মানুষের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা টিকিয়ে রাখছেন।’
শ্রীমঙ্গল সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেনের ভাষ্য, ‘শ্রীমঙ্গল এমন একটি জায়গা যেখানে পর্যটক কিংবা স্থানীয় লোকজন গাড়িতে কিছু ফেলে গেলে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। জাহিদের সততা তারই প্রমাণ।’
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মীর এম এ সালাম বলেন, ‘প্রবাসীর ব্যাগ ফিরিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে সততা ও মানবিকতা এখনো হারিয়ে যায়নি। সমাজে জাহিদদের মতো মানুষই আস্থা আর ভালোবাসার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। আমরা মন থেকে দোয়া করি তাঁর জন্য। প্রতিটি মানুষকেই জাহিদের মতো এরকম হওয়া উচিত।’







