কৃষির গ্রাম থেকে পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র, বদলে যাওয়া রাধানগর
একসময় আখ, লেবু, আনারস ও কাঁঠাল চাষের জন্য পরিচিত ছিল শ্রীমঙ্গলের ছোট্ট গ্রাম রাধানগর। কৃষিই ছিল এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে পুঁজি করে কৃষিনির্ভর এই গ্রাম এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পাঁচতারকা মানের রিসোর্টসহ একটি গ্রামেই গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ, হোটেল ও গেস্টহাউস। আর পর্যটনকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার পাঁচ শতাধিক মানুষের।
চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরের রাধানগর এখন বছরজুড়েই মুখর পর্যটকের পদচারণায়। সবুজ চা-বাগান, উঁচুনিচু টিলা, ঘন বৃক্ষরাজি আর লাউয়াছড়ার কাছাকাছি অবস্থান গ্রামটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। প্রতিদিন গড়ে কয়েক শ পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন এবং রিসোর্ট-কটেজে রাত্রিযাপন করেন। ছুটির দিনগুলোতে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার পর রাধানগরে আখচাষের প্রসার ঘটে। পরে আখের জায়গা দখল করে সুগন্ধি লেবু, আনারস ও কাঁঠালের বাগান। দীর্ঘদিন কৃষিকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল এই গ্রামে ২০০৮-০৯ সালের দিকে পর্যটনের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে গ্রামের অর্থনীতির চিত্র। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্যোক্তারাও এখানে বিনিয়োগ শুরু করেন।
এখন রাধানগরের অর্থনীতির বড় অংশই পর্যটননির্ভর। কেউ রিসোর্ট ও কটেজ পরিচালনা করছেন, কেউ রেস্তোরাঁ ব্যবসা করছেন। কেউ পর্যটক পরিবহন, ট্যুর গাইড কিংবা স্থানীয় পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। কাঠ, বাঁশ ও স্থানীয় উপকরণে তৈরি পরিবেশবান্ধব স্থাপনাগুলোও পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের পরিচালক তাপস দাশ বলেন, ‘পর্যটন শিল্প রাধানগরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। পর্যটকদের খাবার, আবাসন ও যাতায়াতকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’

শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্টের পরিচালক তানভীর লিংকন আহমেদ বলেন, ‘২০১২ সালে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ধারণা নিয়ে রিসোর্টটি গড়ে তুলি। এরপর এলাকায় একের পর এক পর্যটনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।’
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক ইভা বলেন, ‘আমি একাধিকবার এখানে এসেছি। জায়গাটি এতটাই সাজানো-গোছানো যে দেখে বোঝাই যায় না এটি গ্রাম নাকি আধুনিক কোনো পর্যটন শহর।’
আরেক পর্যটক রাসেল বলেন, ‘এখানে পাহাড় ও প্রকৃতির ক্ষতি না করেই অনেক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের চেষ্টা রাধানগরকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনস্থলে পরিণত করেছে।’
শ্রীমঙ্গল ট্যুর অপারেটর অ্যান্ড ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম বলেন, ‘দেশি-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক শ্রীমঙ্গলে আসেন। তাঁদের যাতায়াত, আবাসন ও নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে ট্যুর অপারেটর ও গাইডরা কাজ করছেন।’

রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের সদস্যসচিব মো. তারিকুর রহমান পাপ্পু বলেন, ‘শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, এখানকার মানুষের আন্তরিকতা ও অতিথিপরায়ণ আচরণও রাধানগরের পর্যটন বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। কৃষিনির্ভর অতীত পেরিয়ে রাধানগর আজ মৌলভীবাজার জেলার পর্যটনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে রাধানগর এলাকায় রাত্রিকালীন সড়কবাতির প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ চলছে।’
প্রকৃতির বুক চিরে গড়ে ওঠা রাধানগর আজ শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের বদলে যাওয়া পর্যটন অর্থনীতির প্রতীক। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে ছোট্ট এই গ্রাম দেশের পর্যটন শিল্পে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।







