জন্ম থেকেই অন্ধ দুই বোন, মায়ের আকুতি ‘একবার যদি পৃথিবীটা দেখতে পেত’
চা শ্রমিক পরিবারের সিমী ও সোহানার পৃথিবী অন্ধকার। বাবা নেই, মা দৈনিক মজুরিতে চার সন্তান নিয়ে সংগ্রাম করছেন। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে দুই মেয়ের চোখে আলো ফেরানোর আকুতি পরিবারের।
পৃথিবীর আলো কেমন, মা দেখতে কেমন কিংবা বাবার মুখটি কেমন ছিল! তা কোনো দিনই জানা হয়নি দুই বোনের। জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সিমী আক্তার (১৮) ও সোহানা আক্তার (৭)। অন্ধকারের মধ্যেই বেড়ে ওঠা দুই কন্যার একটাই স্বপ্ন-একবার চোখে পৃথিবীটা দেখা।
তাদের বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগানে। মৃত চা শ্রমিক মদরিছ আলী ও আসমা আক্তার দম্পতির চার মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সিমী ও চতুর্থ সোহানা জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ২০১৯ সালের ২২ মে চা কারখানায় কর্মরত অবস্থায় ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাবা মদরিছ আলী। এরপর চার কন্যাকে নিয়ে শুরু হয় মা আসমা আক্তারের একার জীবনসংগ্রাম।
চা শ্রমিক হিসেবে দৈনিক ১৭৮ টাকা মজুরিতে সংসার চালান আসমা। নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে দুই মেয়ের উন্নত চিকিৎসার ব্যয় বহন তাঁর কাছে প্রায় অসম্ভব।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আসমা বলেন, ‘ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করাই যেখানে কঠিন, সেখানে চিকিৎসা করাব কী দিয়ে? মেয়েগুলোর খুব ইচ্ছা লেখাপড়া করার। কেউ যদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে হয়তো ওরাও পৃথিবীটা দেখতে পারত।’
ছোট্ট সোহানা বলে, ‘শুনেছি আমাদের মতো বাচ্চারাও লেখাপড়া করে, খেলাধুলা করে। সরকার যদি আমাদের সাহায্য করত, তাহলে হয়তো আমরাও পৃথিবীটা দেখতে পেতাম।’
বড় বোন সিমীর আক্ষেপ আরও গভীর। ‘বাবা বেঁচে থাকতে তাঁর মুখটিও দেখতে পারিনি। খুব ইচ্ছা হয়, মায়ের মুখটা একবার দেখি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও বৃক্ষপ্রেমী বিষ্ণু হাজরা রাজু জানান, ‘দুই বোনকে একবার মৌলভীবাজারের একটি চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থাভাবে আর চিকিৎসার পরবর্তী উদ্যোগ নিতে পারেনি পরিবার।’
এদিকে বিষয়টি জানার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘দুই বোনের মধ্যে একজনকে ইতিমধ্যে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। অন্যজনকেও ভাতার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপজেলা সমাজসেবা অফিসকে বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেলা প্রশাসকও বিষয়টি অবগত আছেন। পরিবার চাইলে প্রশাসনের মাধ্যমে চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে তারা দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে কি না, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামতের ওপর নির্ভর করবে।’
জন্ম থেকেই অন্ধকারে থাকা সিমী ও সোহানা জানে না পৃথিবীর রং কেমন। তবু তাদের মনের ভেতর জেগে আছে আলোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সঠিক পরামর্শ এবং সমাজের মানবিক মানুষের সহযোগিতার হাত।







