বিশ্ববাজারে সোনার দামে ইতিহাসের নতুন রেকর্ড
বিশ্ববাজারে সোনার দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বুধবার (১৫ অক্টোবর) ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি সোনার দাম ৪ হাজার ২০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৫ লাখ ৯ হাজার ৮১ টাকা (১ আউন্স ≈ ২.৪৩ ভরি)।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার আরও কমাতে পারে— এমন প্রত্যাশা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ রেকর্ডমূল্য ছুঁয়েছে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে স্পট গোল্ডের দাম দাঁড়ায় আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ২০৩ দশমিক ৭৯ ডলার, যা আগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এর আগে সেশনে দাম উঠেছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২১৭ দশমিক ৯৫ ডলারে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিসেম্বর ডেলিভারির জন্য ফিউচার চুক্তিতে সোনার দাম বেড়ে দাঁড়ায় আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ২২০ দশমিক ২০ ডলার, যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
উল্লেখ্য, ‘স্পট গোল্ড’ বলতে তাৎক্ষণিক কেনাবেচার জন্য নির্ধারিত সোনার বর্তমান বাজারমূল্যকে বোঝানো হয়।
এ বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সুদের হার কমানোর প্রক্রিয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক সোনা ক্রয়, ডি-ডলারাইজেশনের ধারা এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) শক্তিশালী প্রবাহ- সব মিলিয়ে এই উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে।
রূপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামেও উত্থান
সোনার দাম বৃদ্ধির প্রভাবে রূপার দামও বেড়ে আউন্সপ্রতি ৫২ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) এটি রেকর্ড ৫৩ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছিল। স্পট বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই বৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
পাশাপাশি, প্লাটিনামের দাম বেড়ে আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৬৫৭ দশমিক ০৫ ডলার ও প্যালাডিয়ামের দাম বেড়ে ১ হাজার ৫৫১ দশমিক ১৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা যথাক্রমে ১ দশমিক ২ ও ১ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
সোনার দাম ৫,০০০ ডলার ছোঁয়া অসম্ভব নয়
অ্যাকটিভট্রেডসের বিশ্লেষক রিকার্ডো ইভানজেলিস্তা বলেন, মার্কিন সরকারের চলমান শাটডাউন দীর্ঘায়িত হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ফেড) কর্মকর্তাদের আরও নরম মনোভাবের বক্তব্য ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সোনার দামে আরও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদে আউন্সপ্রতি সোনার দাম ৫ হাজার ডলার স্পর্শ করা মোটেই অসম্ভব নয়।
ডলার দুর্বল ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ফেড) সুদের হার কমানোর জল্পনা বাড়ছে
ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর বুধবার (১৫ অক্টোবর) ডলার সূচক অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে দুর্বল হয়। বাজার এখন প্রায় নিশ্চিত যে, অক্টোবর মাসে ২৫ বেসিস পয়েন্ট ও ডিসেম্বরেও আরও এক দফা সুদ কমানো হতে পারে, যার সম্ভাবনা যথাক্রমে ৯৬ ও ৯৩ শতাংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন চীনের সঙ্গে কিছু বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এর আগে মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) দুই দেশ পরস্পরের ওপর পাল্টা বন্দর শুল্ক আরোপ করে।
শাটডাউনের প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাজারেও
যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের শাটডাউন অব্যাহত থাকায় সরকারি অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ বন্ধ রয়েছে, যা শুধু দেশটির নয়, জাপানসহ অন্যান্য দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির সময়ে সোনা সবসময়ই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার, কম সুদের হার পরিবেশেও এই ধাতুর দাম সাধারণত বাড়ে।
এএনজেড ব্যাংকের পণ্য বিশ্লেষক সোনি কুমারি বলেন, আমরা সোনার এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে অতিরিক্ত ক্রয়ের ইঙ্গিত
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সোনার রিলেটিভ স্ট্রেংথ ইনডেক্স (আরএসআই) বর্তমানে ৮৫, যা বাজারে ‘অতিরিক্ত ক্রয়’-এর ইঙ্গিত দেয়।
সূত্র: রয়টার্স







