হামাগুড়ি দিয়ে কলেজে, এবার সরকারি চাকরির স্বপ্ন মনার
পা দুটি অচল, বাঁ হাতেও নেই শক্তি। তবু দারিদ্র্য আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে এইচএসসি পাস করেছেন জুড়ীর মনা বেগম। এবার তাঁর স্বপ্ন ডিগ্রি শেষ করে সরকারি চাকরি।
সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটতেও পারেন না। বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমরে নেই প্রয়োজনীয় শক্তি। তাই ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়িই তাঁর চলার পথ। এভাবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার মনা বেগম (২০)। এখন তাঁর নতুন স্বপ্ন-ডিগ্রি পড়া শেষ করে সরকারি চাকরি করা।
মনা গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর এলাকার দিনমজুর হারিছ মিয়া ও আমিনা বেগমের মেয়ে। পাশের ফুলতলা ইউনিয়নের শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ২.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। তার আগে মনা ২০২৩ সালে স্থানীয় সাগরনাল উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ ২ দশমিক ৫৮ পেয়ে এসএসসি পাস করেন।
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা মনার কাছে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের। বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ি দিয়ে গাড়িতে উঠতে হতো। এরপর বাসে কলেজে যাওয়া। ক্লাস শেষে আবার একই পথ ধরে ফিরতে হতো বাড়িতে।
মনা বলেন, ‘এভাবেই কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু ভর্তি ও বই কেনার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। তারপরও আমি পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চাই।’
তবে স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন অভাব। বাবা ও ছোট ভাই দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চালান। জরাজীর্ণ একটি ঘরে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন মনা। তাঁর মা আমিনা বেগম বলেন, ‘মেয়েটারে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছি। এখন টাকার অভাবে আর পড়াতে পারছি না। একটা অটোরিকশা থাকলে অন্তত সে সহজে চলাফেরা করতে পারত।’
মনার জন্য একটি অটোরিকশা এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সহযোগিতা চান স্থানীয়রাও। তাদের মতে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করা মনার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
জুড়ীর সামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা বলেন, ‘মনা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব আগ্রহী ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে অনেক কষ্ট করে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করত।’
শরীর তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি, দারিদ্র্যও পারেনি তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিতে। হামাগুড়ি দিয়ে শিক্ষার পথ পাড়ি দেওয়া মনা এখন শুধু একটু সহযোগিতার অপেক্ষায়-যাতে তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি একদিন তাঁকে নিজের পায়ে না হলেও, নিজের পরিচয়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।







