পাম্প বন্ধ, পানির নিচে কাউয়াদিঘি হাওর
মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজনগরের কাশিমপুর পাম্প হাউসের পাম্পগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সার্বক্ষণিক চালু না থাকায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে। এতে পাকা আউশ ধান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নজুড়ে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে কাউয়াদিঘি হাওর। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষিজমি রক্ষায় ১৯৭৬ সালে কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে মনু সেচ প্রকল্প নেওয়া হয়। ১৯৮০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। হাওরের উদ্বৃত্ত পানি কুশিয়ারা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য কাশিমপুরে স্থাপন করা হয় আটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরের পানি দুই থেকে আড়াই ফুট কমানো গেলে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ সম্ভব। এতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পানি না কমায় সেই সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চিত।
হাওরপাড়ের কৃষকেরা জানান, গত বোরো মৌসুমেও তারা কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। এবার পাকা আউশ ধানও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। আমনের চারা রোপণের সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক জমি এখনো পানির নিচে।
রাজনগরের ফতেপুর ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের কৃষক মানিক মিয়া বলেন, ৬ কিয়ার জমিতে আমন আবাদ করতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চারা রোপণ করতে পারছেন না। একই গ্রামের কৃষক নুরুজ্জামান ১৩ কিয়ার জমিতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করেছেন। তাঁর মতে, গত বছর ওই জমি থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ধান বিক্রি করলেও এবার পানির কারণে আবাদই অনিশ্চিত।
বালিগাঁও এলাকার বাসিন্দা তুহিন জুবায়ের বলেন, হাওরের চারপাশে বাঁধ থাকায় পানি বেড়ে গেছে। বালিগাঁও, দুগাঁও, পৈতুরা, বাঙালিয়া, খলাগাঁও পশ্চিম, মিয়ারকান্দি ও উত্তরভাগসহ কয়েকটি এলাকার এক হাজারের বেশি হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে আছে। এসব এলাকার জমি মূলত আমননির্ভর হওয়ায় কৃষকের ক্ষতি আরও বেশি।
হাওড় রক্ষা সংগ্রাম কমিটির মৌলভীবাজার সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কাউয়াদিঘি হাওরের বর্তমান সংকট সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। পাম্প নিয়মিত চালু থাকলে এভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না। দ্রুত দুই থেকে আড়াই ফুট পানি নামানো না গেলে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’

হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব খছরু চৌধুরীর অভিযোগ, ২০০৪ সালে হাওরের বিলের পানির স্তর নির্ধারণী স্কেল সরিয়ে পাম্প হাউসসংলগ্ন গভীর ক্যানেলে স্থাপন করা হয়। এতে বর্ষা ও শীত—দুই মৌসুমেই পানি আটকে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ‘প্রতিবার একই সংকট দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে হাওরের কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে,’ বলেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন, ‘বর্তমানে হাওরের পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৬০ মিটার। নির্ধারিত উচ্চতা সাড়ে ৮ মিটারের মধ্যে। বর্তমান পাম্প সক্ষমতায় বৃষ্টিহীন অবস্থাতেও দুই ফুট পানি কমাতে অন্তত ৪০ দিন সময় লাগবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সরেজমিনে আউশের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেছে। দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে পানি নিষ্কাশন ও আমন চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’







