শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন

কোরআন ও হাদিসের বিশ্লেষণে জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ

ডেস্ক রিপোর্ট / ৫৮ দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা : জুমা, আয়াত : ৯

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে   

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا نُودِىَ لِلصَّلَوٲةِ مِن يَوْمِ ٱلْجُمُعَةِ فَٱسْعَوْاْ إِلَىٰ ذِكْرِ ٱللَّهِ وَذَرُواْ ٱلْبَيْعَ‌ۚ ذَٲلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

সরল অনুবাদ

৯. হে ঈমানদারগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য ডাকা হয় তখন তোমরা আল্লাহ্‌র স্মরণে ধাবিত হও এবং কেনা-বেচা ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা জুমার আলোচ্য আয়াতটিতে বলা হচ্ছে যে, জুমার দিনটি মুসলিমদের সমাবেশের দিন। তাই এই দিনকে ‘ইয়াওমুল জুমু’আ’ বলা হয়। এইদিনের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন হাদিসে এসেছে; যেমন, আল্লাহ তাআলা নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও সমস্ত জগৎকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন।

এই ছয়দিনের শেষদিন ছিল জুমার দিন। (মুসলিম, হাদিস: ২৭৮৯) আরও এসেছে, “যে দিনগুলোতে সূর্য উদিত হয় তন্মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দিন হচ্ছে, জুমার দিন। এই দিনেই আদম আলাইহিস সালাম সৃজিত হন, এই দিনেই তাকে জান্নাতে দাখিল করা হয় এবং এই দিনেই জন্নাত থেকে পৃথিবীতে নামানো হয়। আর কেয়ামত এই দিনেই সংঘটিত হবে।

” (মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪) আরও এসেছে, “এই দিনে এমন একটি মুহুর্ত আছে, যাতে মানুষ যে দো’আই করে, তাই কবুল হয়।” (বুখারি. হাদিস : ১৯৩৫; মুসলিম, হাদিস: ৮৫২)

আল্লাহ তাআলা প্রতি সপ্তাহে মানবজাতির সমাবেশ ও ঈদের জন্যে এই দিন রেখেছিলেন। কিন্তু পূর্ববতীর্ণ উম্মতরা তা পালন করতে ব্যর্থ হয়। ইয়াহুদীরা ‘ইয়াওমুস সাবত’ তথা শনিবারকে নিজেদের সমাবেশের দিন নির্ধারিত করে নেয় এবং নাসারারা রবিবারকে।

আল্লাহ তা’আলা এই উম্মতকে তওফীক দিয়েছেন যে, তারা শুক্রবারকে মনোনীত করেছে। অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমরা সবশেষে এসেও কিয়ামতের দিন অগ্রণী হব। আমরাই প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করব। যদিও তাদেরকে আমাদের আগে কিতাব দেয়া হয়েছিল, আর আমাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের পরে। কিন্তু তারা এতে মতভেদে লিপ্ত হয়েছে।

অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে তাদের মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পথ দিয়েছেন। এই যে দিনটি, তারা এতে মতভেদ করেছে। অত:পর আল্লাহ আমাদেরকে এ দিনের সঠিক হেদায়াত করেছেন। তা হলো, জুমার দিন। সুতরাং আজ আমাদের, কাল ইয়াহুদীদের। আর পরশু নাসারাদের।” (বুখারি, হাদিস: ৮৭৬; মুসলিম, হাদিস: ৮৫৫)

সম্ভবত ইয়াহুদীদের আলোচনার পর পবিত্র কুরআনের জুমার আলোচনার কারণ এটাই যে, তাদের ইবাদতের যুগ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন কেবলমাত্র মুসলিমদের ইবাদতের দিনের প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আর তা হচ্ছে জুমার দিন। মূর্খতাযুগে শুক্রবারকে “ইয়াওমে আরূবা” বলা হত। বলা হয়ে থাকে যে, আরবে কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এর নাম ‘ইয়াওমুল জুমুআ’ রাখেন। কারণ, জুম’আ শব্দটির অর্থ একত্রিত করা। এই দিনে কুরাইশদের সমাবেশ হত এবং কাব ইবনে লুয়াই ভাষণ দিতেন। সারকথা এই যে, ইসলাম পূর্বকালেও কা’ব ইবনে লুয়াই-এর আমলে শুক্রবার দিনকে গুরুত্ব দান করা হত। তিনিই এই দিনের নাম জুমার দিন রেখেছিলেন। কিন্তু সহিহ হাদীসে পাওয়া যায় যে, “আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টিকে এই দিন একত্রিত করা হয়েছিল বলেই এই দিনকে জুম’আ নামকরণ করা হয়েছে।” (মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৪১২, নং ১০২৮; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ ৩/১১৮, নং ১৭৩২; ত্বাবারানী: মুজামুল কবীর ৬/২৩৭ নং ৬০৯২; মুজামুল আওসাত: ১/২৫০, নং ৮২১, মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ২/৩৯০)

আয়াতে উল্লেখিত  نُودِيَ অর্থ যখন ডাকা হয়। এখানে খোতবার আযান বোঝানো হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর, তাফসিরে বাগভী) সায়েব ইবনে ইয়ায়ীদ বলেন, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ, আবু বকর এবং উমরের যুগে জুম’আর দিনে ইমাম যখন মিম্বরে বসত তখন প্রথম আযান দেয়া হত। তারপর যখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগ আসল এবং মানুষ বেড়ে গেল তখন তৃতীয় আহবানটি তিনি বাড়িয়ে দেন” (বুখারি, হাদিস : ৯১২)

আয়াতে বর্ণিত فَاسْعَوْا শব্দের এক অর্থ দৌড়ানো এবং অপর অর্থ কোন কাজ গুরুত্ব সহকারে করা। এখানে এই অর্থ উদ্দেশ্য। কারণ, সালাতের জন্যে দৌড়ে আসতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রশান্তি ও গাম্ভীৰ্য সহকারে সালাতের জন্যে গমন কর।” (বুখারী, হাদিস: ৬৩৬; মুসলিম, হাদিস: ৬০২) আয়াতের অর্থ এই যে, জুমার দিনে জুমার আযান দেয়া হলে আল্লাহর যিকিরের দিকে গুরুত্বসহকারে যাও। অর্থাৎ সালাত ও খোতবার জন্যে মসজিদে যেতে যত্নবান হও। যে ব্যক্তি দৌড় দেয়, সে যেমন অন্য কোন কাজের প্রতি মনোযোগ দেয় না, তোমরাও তেমনি আযানের পর সালাত ও খোতবা ব্যতীত অন্য কাজের দিকে মনোযোগ দিও না।

এখানে ‘যিকর’ বলে জুমার সালাত এবং এই সালাতের অন্যতম শর্ত খোতবাও বোঝানো হয়েছে। বহু হাদিসে জুমার দিনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মসজিদে হাযির হওয়ার গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে জুম’আর দিনে জানাবত তথা অপবিত্র অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়ার মত গোসল করবে, তারপর (প্রথম ঘণ্টায়) মসজিদে হাজির হবে সে যেন একটি উট কুরবানী করল। আর যে ব্যক্তি দ্বিতীয় ঘণ্টায় গেল সে যেন গরু কুরবানী করল। যে তৃতীয় ঘন্টায় গেল সে যেন শিংওয়ালা ছাগল কুরবানী করল। যে চতুর্থ ঘন্টায় গেল সে যেন মুরগী উৎসর্গ করল। যে পঞ্চম ঘন্টায় গেল সে যেন ডিম উৎসর্গ করল। তারপর যখন ইমাম বের হয়ে যায় তখন ফেরেশতারা (লিখা বন্ধ করে) ইমামের কাছে হাযির হয়ে যিকর (খুতবা) শুনতে থাকে।” (বুখারি, হাদিস : ৮৮১) তাছাড়া এটা অনেকের নিকট দোয়া কবুল হওয়ার সময়।

এক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে কোন মুসলিম যদি সে সময়ে আল্লাহর কাছে কোন কল্যাণ চায় তবে অবশ্যই তিনি তাকে সেটা দিবেন”। (বুখারি, হাদিস: ৬৪০০)


এই বিভাগের আরও খবর :
এক ক্লিকে বিভাগের খবর